পিয়ারীমােহন সেনের মধ্যম পুত্র কেশবচন্দ্র ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর কলকাতার কলুটোলায় জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতামহ রামকমল সেন , বালক কেশবচন্দ্র ভবিষ্যতে বিশ্ববিখ্যাত মানুষে পরিণত হবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন । তার মানবচরিত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে বাস্তবে পরিণত হয়েছে । বাড়িতে পড়াশােনা করার পরে কেশবচন্দ্র সেন হিন্দু কলেজে ভর্তি হন । এখানকার পড়া শেষ করে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশােনা করেন । ছাত্রজীবনেই তার বাগ্মিতার পরিচয় পাওয়া যায় । খেলাধূলায় তিনি খুব উৎসাহী ছিলেন । সবকিছুতেই নেতৃত্বসুলভ মনােভাব প্রকাশ পেত । সমাজ সংস্কারক আন্দোলনকে এগিয়ে নেবার উদ্দেশ্যে হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজ হলে ‘ হিন্দু বিধবা বিবাহ ’ নাটক তিনি মঞ্চস্থ করেন । এই নাটক সমাজে বিরাট আলােড়ন সৃষ্টি করে । এ সময়ে তার বয়স খুবই কম ।
ছাত্রজীবনে তিনি বাইবেল পাঠ করেন । ইংরেজি সাহিত্য ও বিজ্ঞান পড়ার ফলে তিনি ঈশ্বর এক ’ এই বােধে বিশ্বাসী হন । তিনি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে স্বগৃহে বন্ধুদের নিয়ে ‘ গুডউইল ফ্র্যাটারনিটি ’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন । এখানেই তার বক্ত্রিতার অভ্যাস গড়ে ওঠে । অপরের ওপর ধর্মীয় প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাও এখান থেকেই জন্মে । ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে একখানি ব্রাহ্মপুস্তিকা পড়ে তিনি একেশ্বরবাদ সম্পর্কে আরও বেশি আগ্রহশীল হন । দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাবে তিনি ব্রাহ্মধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন । তাঁর সঙ্গে তিনিও সিংহল ভ্রমণে যান ।
স্বদেশে ফিরে তিনি ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গলে ২৫ টাকা বেতনে কেরানির কাজ পান । পরে তার বেতন ৫০ টাকা হয় । এ সময় ‘ ইয়ংবেঙ্গল ’ নামে একটি পত্রিকা তিনি প্রকাশ করেন । ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে ‘ সঙ্গতসভা ’ প্রতিষ্ঠায় কেশবচন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন । দুবছর পরে তিনি উহার আচার্য হন । এ সময় দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার ফলে তিনি সস্ত্রীক বাড়ি হতে বিতাড়িত হন । এতে কেশবচন্দ্র দমলেন না । সমাজের উন্নতি সাধনের জন্য পাঁচ বছর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সহযােগিতা করে চলেন ।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপবীত ত্যাগ করেছিলেন । কেশবচন্দ্রের ইহা পছন্দ হয়নি । ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণের যুবক - যুবতীদের মধ্যে বিবাহের ব্যবস্থা করেন কেশবচন্দ্র । ফলে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর মতের অমিল হয় । কেশবচন্দ্র ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদি ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করেন । তিনি পূর্বেই সারা ভারত ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে সারা ভারতবর্ষ ঘুরে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করেন । তিনি ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে মেডিক্যাল কলেজের থিয়েটার ভবনে “ যিশুখ্রিস্ট ’ , ‘ ইউরােপ ও এশিয়া ' শীর্ষক ভাষণে দেশবাসীকে মুগ্ধ করেন । এ সময় অনেকের ধারণা জন্মে যে তিনি খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছেন । পরবর্তীকালে এই ধারণা মিথ্যায় পরিণত হয় । শেষ পর্যন্ত ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দেই ব্রাহ্মসমাজ দুভাগ হয়ে যায় । ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে ভাইসরয় লরেন্সের আমন্ত্রণে কেশবচন্দ্র সিমলা যান এবং তার কথামতাে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ব্রাহ্ম বিবাহ আইন ’ বিল পাশ হয় । কেশবচন্দ্রের শিষ্যবৃন্দ সারা দেশে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করতে থাকেন ।
কেশবচন্দ্র যিশুখ্রিস্টের ধর্মনীতির ওপর ভিত্তি করে ভগবৎ প্রেমকে ব্রাহ্মধর্মের মূলনীতিরূপে গ্রহণ করেন এবং চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব সংকীর্তনের অনুকরণে ব্রাহ্মসমাজেও সংকীর্তন চালু করে যিশুবাদ ও চৈতন্যবাদের সমন্বয় ঘটান । ব্রাহ্মসমাজের প্রগতিশীল দলের স্ত্রী - স্বাধীনতা সম্পর্কে অত্যন্ত উদার মনােভাব না দেখালেও পর্দা প্রথার বিলােপ সাধন , অসবর্ণ বিবাহ চালু ও স্ত্রীশিক্ষার ক্ষেত্রে তার উদার মনােভাব ছিল । ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র সেন নিজ নাবালিকা কন্যাকে কোচবিহারের হিন্দু মহারাজার সহিত বিবাহ দিলে প্রগতিশীলগণ তার নেতৃত্ব ত্যাগ করে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ তৈরি করেন । কেশবচন্দ্রের ব্রাহ্মসমাজ নববিধান নামে পরিচিতি লাভ করে ।
এই ধর্মমতের সঙ্গে অনেকের অনৈক্য থাকলেও সবাইকে একবাক্যে স্বীকার করতে হবে ইনি বর্তমানে বাংলার যুগধর্মের প্রবর্তক ছিলেন । জীবনবেদ ’ ওঁর আধ্যাত্মিক জীবনের ইতিহাস । ইনি একসময় রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সংস্পর্শে আসেন এবং পরস্পরের মধ্যে গভীর আত্মীয়তার সূত্রপাত হয় ।
১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র ইংল্যান্ডে যান । ওই বছর ১২ এপ্রিল হ্যানােভার স্কোয়ার হলে তাকে সংবর্ধনা জানানাে হয় । এ বছরই ১০ এপ্রিল তিনি ডা . মার্টিনের চ্যাপেলে উপদেশমূলক বক্তৃতা দেন । পরে ২৪ ‘ স্পাজিয় টের্নেকলে ভারতের প্রতি ইংল্যান্ডের কর্তব্য সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়ে সুনাম অর্জন করেন । মহারানির ব্যক্তিগত সচিব কর্তৃক তিনি অভ্যর্থনা পান । এ সমস্ত ঘটনাই কেশবচন্দ্র সেনের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রমাণ করে । ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে কেশবচন্দ্র সেনের মৃত্যু হয় ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিধবা - বিবাহ আইন কেশবচন্দ্র সমর্থন করেন । ফলে হিন্দু সমাজের ওপর ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব বৃদ্ধি পায় । পণপ্রথা , বাল্যবিবাহ প্রভৃতি নানাবিধ প্রগতিশীল সংস্কারের জন্য কেশবচন্দ্রের সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ । তাই কেশবচন্দ্র সেনকে হিন্দুসমাজের ত্রাণকর্তা বললেও অত্যুক্তি হয় না ।

0 Comments