ইনি ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে দক্ষিণ ভারতের ত্রিচিনােপল্লি নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতা চন্দ্রশেখর আয়ার ওয়ালটেয়ারে এ . ভি . এন . কলেজের অধ্যাপক ছিলেন । শৈশব হতেই রমন মেধাবী ছিলেন । মাত্র ১২ বছর বয়সে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে Madras Presidency কলেজে ভর্তি হন । ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে সেখান হতে B.A এবং ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে পদার্থবিদ্যায় M.A - তে প্রথম বিভাগে প্রথম হন । ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং কলকাতায় সহকারী অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল পদে যােগ দেন । তিনি I.S.A. - র সম্পাদক আশুতােষ মুখার্জীর সংস্পর্শে আসেন এবং উক্ত সংস্থার সভ্য হয়ে গবেষণা আরম্ভ করেন । ১৯১৭খ্রিস্টাব্দে সরকারি চাকুরি ত্যাগ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হন । এ সময় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিত অধ্যাপক পদে বিলেত ফেরত ছিল নিয়ােগের প্রধান শর্ত । ডা . অমৃতলাল সরকার ও আশুতােষ মুখার্জীর প্রচেষ্টায় ওই শর্ত ভেঙে রমনকে উক্ত পদে নিয়ােগ করা হয় । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইউরােপ যাত্রা করেন ।
ছাত্রজীবনেই তাঁর বৈজ্ঞানিক প্রতিভার পরিচয় মেলে । তিনি মেন্ডেস - এর ধ্বনি তরঙ্গ ছাত্রাবস্থাতেই সংশােধন করেন এবং সুনাম অর্জন করেন । ইউরােপ যাত্রার সময় ভূ - মধ্যসাগরের জলে হিমবাহের মধ্যে নীল আলাে লক্ষ্য করেন । ভারতে ফিরে এসে সাগরের জল নীল কেন তা তিনি ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হন । জল ও বরফের মধ্যে সূর্যের আলাের বিকিরণ সম্পর্কে গবেষণা করেই তিনি এ সমস্যার ব্যাখ্যা করতে সফল হন । এই গবেষণাকে ভিত্তি করেই তিনি রমন এফেক্ট ’ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন । এই গবেষণার কাজে মার্কারি আর্ক হতে বিচ্ছুরিত একবর্ণী আলােকরশ্মি ও একটি ফোটোগ্রাফ তিনি ব্যবহার করেন । কয়েকটি পদার্থের মধ্যে আলােকরশ্মি বিসরিত করে তিনি বর্ণালীতে একাধিক নতুন আলােকরেখার সন্ধান পান । এই আলােকরেখাগুলােকে Raman ray বলে । এই নতুনত্বই Raman scattering ’ বলে পরিচিত । সংক্ষেপে রমন এফেক্টের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে — কোনাে বস্তুর অণুতে যদি আলােক সংঘাত হয় তাহলে আলাের কম্পন সংখ্যা বৃদ্ধি পায় , আবার হ্রাস পায় । ফলে আলােকের বিকিরণ ঘটে । চুম্বকের আকর্ষণের ওপর সঙ্গীত যন্ত্রের তত্ত্বের ওপর তাঁর গবেষণাও উল্লেখযােগ্য ।
এই বিজ্ঞানী বহু সম্মানের অধিকারী হন । ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে রমন এফেক্ট ’ আবিষ্কারের জন্য তিনি নােবেল প্রাইজ পান । ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি লেনিন শান্তি পুরস্কার পান । এ ছাড়া আরও বহু সম্মানের তিনি অধিকারী হন । বহু সংস্থার তিনি প্রতিষ্ঠাতা । সুদীর্ঘ ১৫ বছর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদে থাকাকালীন তিনি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা ছেড়ে মহীশূরে চলে যান এবং সেখানে ব্যাঙ্গালাের রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর হন । তিনি ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স ( ব্যাঙ্গালাের ) -এর ডাইরেক্টর নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ১০ বছর ওই পদে ছিলেন । ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি আই . এ .এস . প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই উহার সভাপতি হন । তিনি ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ‘ রমন রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এখানেই গবেষণা চালান । ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ২১ নভেম্বর ব্যাঙ্গালােরে তার মৃত্যু হয় ।
রমনের আবিষ্কার পরবর্তীকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীদের অনেক নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারে সাহায্য করেছে । লর্ড র্যালের আবিষ্কারের পটভূমি তিনিই । ফলে অণু সম্পর্কে বহু তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে । আলাের তরঙ্গ তত্ত্ব , বিকিরণ ধর্ম ও তাপগতিবিদ্যা সম্পর্কে গবেষণার পথ আরও উন্মুক্ত হয়েছে । এই তত্ত্ব সম্পর্কে বিভিন্ন দেশে ১৮০০ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে । অপরদিকে লেসার রশ্মির আবিষ্কার হয়েছে । ইহা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে রমন এফেক্টের অবদান উল্লেখযােগ্য । বিশ্লেষণী ও সাংগঠনিক রসায়নে আজকাল রমনের তত্ত্বের প্রয়ােগ আধুনিকতম রূপে করা হচ্ছে । এভাবে আগামী দিনের বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাবার এক উপযােগী ক্ষেত্র তৈরি করে যান রমন । তাই আমরা গর্বিত । বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছেও রমন তাই বরণীয় তার কর্মে ও গবেষণার যা ভাবলে অবাক হতে হয় ।

0 Comments