বঙ্কিমচন্দ্র যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তার পিতা মেদিনীপুরের Deputy Collector ছিলেন । জন্মের পর হতে ৬ বছর পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্র কাঁঠলপাড়াতেই কাটান । এ সময় পাঠশালায় গুরুমহাশয় তাকে বাড়িতে এসে পড়াতেন । তার নিয়মমাফিক বিদ্যালয় জীবন পিতার কর্মস্থল মেদিনীপুরে একটি ইংরেজি School তে আরম্ভ হয় । এগারাে বছরে তিনি Hoogly College প্রবেশ করেন । ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই কলকাতার Presidency College তে আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন । ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে Kolkata University তে B. A. পরীক্ষার ব্যবস্থা করলে বঙ্কিমচন্দ্র বি . এ . পরীক্ষায় বসেন এবং উত্তীর্ণ হন । এরপর বঙ্কিমচন্দ্র সরকারি চাকুরি পান, Deputy Magistrate পদ এবং বিশেষ যােগ্যতার সঙ্গে কাজ করেন ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত । এরপর অবসর গ্রহণ করেন । ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে তার রচিত ‘ দুর্গেশনন্দিনী ’ উপন্যাস সাহিত্যজগতের রুচিতে যুগান্তর আনে ।
ছাত্রাবস্থাতেই তার সাহিত্য সাধনা , আরম্ভ হয় । ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদিত সংবাদ 'প্রভাকর’ মাসিকপত্রে তার লেখা প্রকাশিত হয় । কিছু কিছু রচনা এডুকেশন গেজেটেও প্রকাশিত হয় । খুলনায় অবস্থানকালে তিনি রাজমােহন’স ওয়াইফ নামে উপন্যাস রচনা করেন । তাঁর কপালকুণ্ডলা ( ১৮৬৬ ) , মৃণালিনী ( ১৮৬৯ ) , যুগলাঙ্গুরীয় ( ১৮৭৪ ) , চন্দ্রশেখর ( ১৮৭৫ ) , রাজসিংহ ( ১৮৮২ ) ও সীতারাম ( ১৮৮৭ ) প্রকাশিত হয় । স্বদেশবাসীদের মনে দেশপ্রেম জাগানাের উদ্দেশ্যে তিনি আনন্দমঠ ( ১৮৮২ ) , দেবী চৌধুরানী ( ১৮৮৪ ) এবং সীতারাম ( ১৮৮৭ ) প্রকাশ করেন । তার বিষবৃক্ষ ( ১৮৭৩ ) , কৃষ্ণকান্তের উইল ( ১৮৭৮ ) এবং রজনী ( ১৮৭৭ ) আধুনিক পারিবারিক উপন্যাসের উৎসস্থল । মনের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও পরনারীর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা এগুলােতে পরিস্ফুট হয়েছে । তার ইন্দিরা ( ১৮৭৩ ) ও রাধারাণী ( ১৮৭৬ ) বড় গল্পের মতাে ইংরেজি নভেলেট - এর পর্যায়ভুক্ত । তাঁর প্রবন্ধগুলাের মধ্যে লােকরহস্য ( ১৮৭৪ ) , বিজ্ঞান রহস্য ( ১৮৭৫ ) , কমলাকান্তের দপ্তর ( ১৮৭৫ ) , বিবিধ সমালােচনা ( ১৮৭৬ ) , সাম্য ( ১৮৭৯ ) , প্রবন্ধ পুস্তক ( ১৮৭৯ ) , ধর্মতত্ত্ব ( ১৮৮৮ ) , শ্রীমদ্ভগবদগীতা ( ১৮৮৪-১৮৮৮ ) উল্লেখযােগ্য ।
তিনি ' আনন্দমঠ উপন্যাসে বন্দেমাতরম সঙ্গীত রচনা করে দেশপ্রেমের শ্রেষ্ঠ গান রচনা করেন । স্বাধীনতা লাভের সঙ্গে সঙ্গে এই ' বন্দেমাতরম ’ রবীন্দ্রনাথের জনগণমন অধিনায়ক ’ সঙ্গীতের সঙ্গে গণপরিষদে জাতীয় সঙ্গীতরূপে গৃহীত হয় । ভাষায় সাধু এবং চলিত এই দুই রীতির সমন্বয় সাধনে শক্তিশালী । করেছেন । বিভিন্ন সময়ে বহু ছদ্মনামে । ইনি লেখেছেন শ্রী অষ্টমাবতার চট্টোপাধ্যায় , ভীষ্মদেব খােসনবীশ । ‘ সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র হলেন । বাংলা উপখ্যানের । তাঁর সম্পর্কে যত কথাই লেখা যাক — মনে হবে কমই বলা হল । তার ‘ আনন্দমঠ উপন্যাসে , যে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সম্রাজ্ঞী বিদ্রোহর কথা তুলে ধরা হয় তা ছিল সে যুগের বিপ্লবীদের কাছে ‘ গীতা'র মতাে । বঙ্কিমচন্দ্র -শরৎচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ — উনবিংশ শতাব্দীর বাংলাসাহিত্যের নবজাগরণে বঙ্কিমই ছিলেন প্রথম এবং অগ্রগণ্য সাহিত্যিক । আজ তাকে স্মরণ করে , তার অক্ষয় অমর সাহিত্যকীর্তি । অনুধাবন করে এগিয়ে চলার দিন ।
১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল বঙ্কিমচন্দ্র তার কলকাতার বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।

0 Comments