করুণাময়ী জননী মাদার টেরেসা এর জীবনী (Biography of Mother Teresa)



মানবতার বেদীমূলে যাদের জীবন উৎসর্গকৃত তাদের কাছে ভৌগােলিক সীমারেখা নেবার ক্ষেত্র কোনাে বাধাই নয় । আর্ত , পীড়িত ও অসহায় মানুষের সেবাই তাদের ধর্ম । এই শ্রেণির মানুষদের একজন হলেন জননী টেরেসা ।





ইনি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ আগস্ট আড্রিয়াটিক সাগরের তীরে ছােট শহর স্কোপেনে এক আলবেনিয়ান কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । জন্মসূত্রে যুগােশ্লাভিয়ার বাসিন্দা হলেও জাতিসূত্রে তিনি আলবেনিয়ান । তার অতীতের নাম অ্যাগমেসা । তাঁরা ছিলেন দুবােন ও এক ভাই । তার বয়স যখন ৭ বছর তখন তার পিতার মৃত্যু হয় । মাতার কাছে তিনি মানুষ হতে থাকেন । শৈশব হতেই বিশ্বের দুঃখী , আর্ত , অসহায় মানুষের কান্না তার চোখের সামনে ভেসে উঠত । গৃহের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য পরিহার করে আর্তের সেবা করাই তিনি জীবনের মন্ত্ররূপে গ্রহণ করলেন । সুযােগও তার এসে যায় ।





১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ১৮ বছরের অ্যাগমেসাকে যুগােশ্লাভিয়ার জেনুইট সংস্থা আয়ারল্যান্ডের লােরেটো সংঘে পাঠান । সেখান থেকে এলেন কলকাতায় । এন্টালি এলাকায় ১ নং কনবেন্ট লেনে লােরেটো সেন্ট মেরিজ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভূগােলের শিক্ষিকা হন । স্কুলের প্রাচীরের অপর পাড়ে মতিঝিল বস্তি । ওই বস্তিতে গিয়ে আর্তমানুষের সেবা করা শুরু করেন ।





১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তিনি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন । তার নাম হল মাদার টেরেসা । ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট তিনি লােরেটোর পােশাক পরতে আরম্ভ করলেন । আর ভারতকেই নিজের দেশ বলে গ্রহণ করেন । মােট ১৮ বছর শিক্ষকতার পর আরও বেশি করে আর্তের সেবার উদ্দেশ্যে শিক্ষকতার কাজ হতে অবসর গ্রহণ করেন । ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে শিয়ালদহের কাছে ক্রীক লেনের মাইকেল গােমেজের বাড়িতে তিনি আশ্রয় গ্রহণ করেন । ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তারই প্রচেষ্টায় গঠিত হয় ‘ মিশনারিজ অফ চ্যারিটিজ ’ সংঘ । এই বছরেই মহাতীর্থ কালিঘাটে তিনি নির্মল হৃদয় ’ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন । তারই প্রচেষ্টায় হাওড়ায় স্থাপিত হল কুষ্ঠরােগীদের আশ্রম । তিনি মােট ৬০ টি স্কুল , ২১০ টি দাতব্য চিকিৎসালয় , ৫৫ টি কুষ্ঠ চিকিৎসায় ও ২০ টি উদ্ধারাশ্রম স্থাপন করেছেন ।





১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি চান যাতে আশ্রমের বাইরে থেকে কলকাতার বস্তিবাসীদের সেবা করতে পারেন । রােমের কর্তৃপক্ষের কাছেও তিনি অনুমতি চান । আর্তের সেবা প্রত্যেকেরই কাম্য । তাই তিনি অনুমতি পেলেন । ওই বছরের ১৮ আগস্ট একনীলপাড় শাড়ি পরিহিতা সন্ন্যাসিনীর বেশে আমাদের সামনে উপস্থিত হন । সারা বিশ্বেই তার কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে ।





১৯৬৫-৬৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভেনেজুয়েলা , কলম্বাে , তানজানিয়া , রােম , অস্ট্রেলিয়া , জর্ডন , নিউ ইয়র্ক প্রভৃতি অঞ্চলে ‘ মিশনারি অব চ্যারিটিজ ’ গড়ে উঠেছে । চিরন্তনী জননীর রূপ প্রত্যক্ষ করে সারা বিশ্বের মানুষ হয়েছে ধন্য । সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে করুণাময়ী জননী টেরেসার নাম । তার মহৎ কীর্তির স্বীকৃতি এল দেশ - দেশান্তর হতে ।





১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকারের ‘ পদ্মশ্রী ' , ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ‘ পপের শান্তি পুরস্কার । ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ‘ নেহরু ' পুরস্কার । ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মাস্টার অফ ম্যাজেস্টি ’ পুরস্কার এবং ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ভারতরত্ন ’ ও ফিলিপাইনের ম্যাগসেশাই ' পুরস্কার তিনি পান ।





১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর ভারতবর্ষ , পশ্চিমবঙ্গ ও কলকাতার গৌরবের দিন । মাদার টেরেসা পেলেন নােবেল পুরস্কার । ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ হতে মাদার টেরেসা ভারতের নাগরিক । তাই মাদার টেরেসার সম্মান ভারতেরই সম্মান । আর্ত পীড়িতদের নাম পরিচয় - গােত্রহীনদের , ভাগ্য বিড়ম্বিতদের আশ্রয় , আশ্বাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন মাদার টেরেসা জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের মা । মানবতা যেখানে পর্যদস্ত সেখানেই মাদার টেরেসার বলিষ্ঠ প্রতিবাদ । ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ সেপ্টেম্বর এই বিশ্বজননী চিরনিদ্রায় নিদ্রিত হলেও আমাদের কাছে চিরদিন অমর হয়েই থাকবেন ।



Post a Comment

0 Comments