ডা . মহেন্দ্রলাল সরকারএর জীবনী (Biography of Dr. Mahendralal Sarkar)



চিকিৎসাশাস্ত্রে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ডা , মহেন্দ্রলাল সরকার বাংলার এক বিস্ময়কর প্রতিভা । ইনি ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর হাওড়া জেলার পাইকপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতার নাম তারকনাথ সরকার আর মাতার নাম আতররানি দেবী । দরিদ্র ও মেধাবী বলে Hare Schoolভর্তি হবার তিনি সুযােগ পান । ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে এখান হতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন । Hindu College হতে সিনিয়র স্কলারশিপ পেয়ে তিনি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন । ডাক্তারি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ভিদবিদ্যা পড়তে থাকেন । শিবপুর বােটানিক্যাল গার্ডেনের সুপারিন্টেডেন্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ডা . টমসনের সাথে হৃদ্যতার ফলেই তার উদ্ভিদবিদ্যা সম্পর্কে শিক্ষালাভের আগ্রহ জন্মায় । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে এম . ডি . হন ।





তারপর Calcutta Medical College এর সিন্ডিকেটের সদস্য নির্বাচিত হন । ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে Indian Association for the Cultivation of Science নামক আন্তর্জাতিক সংস্থার তিনি প্রতিষ্ঠা করেন । ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি Calcutta Journal of Medicine নামক পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন । ভারতে ওটাই বিজ্ঞান বিষয়ের প্রথম পত্রিকা । ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই পত্রিকায় বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে লিখিত প্রবন্ধ সেযুগের পণ্ডিত ব্যক্তিদের কাছে গ্রহণযােগ্য হয় । ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ‘ হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকায় তিনি অনুরূপ প্রবন্ধ প্রকাশিত করে বিজ্ঞান শিক্ষার তাৎপর্যকে আরও স্পষ্টভাবে জনগণকে বােঝাতে সক্ষম হন । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় , কেশবচন্দ্র সেন , কালীকৃষ্ণ ঠাকুর প্রভৃতি সে যুগের বিখ্যাত ব্যক্তিরা মহেন্দ্রলালের বিজ্ঞানশিক্ষার প্রচার আন্দোলনকে সমর্থন করেন ।





মহেন্দ্রলাল ছােটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন । তার জীবনের একমাত্র সাধনা ছিল বিজ্ঞানচর্চা । তিনি এটা ভালােভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন একটা দেশকে উন্নত করতে হলে তাকে বিজ্ঞানে অনুশীলন দিতে হবে । বিশেষকরে ভারতবর্ষের মতাে দেশের এই বিজ্ঞানচর্চার আবশ্যকতা ভেবে তিনি নিজের জীবন বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন ।





প্রথম প্রথম ডাক্তার সরকার নিজের বাড়িতে বিজ্ঞান ক্লাস খােলেন । প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা ওই ক্লাসে তিনি বক্তৃতা দিতে শুরু করেন । ওই থেকেই তার মনে একটি বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান স্থাপন করার কথা মনে হয় এবং সে সংকল্পের কথা পত্রিকায় প্রকাশ করে বিজ্ঞানচর্চার আন্দোলন চালাতে লাগলেন । এর ফলেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি . এ . ক্লাসে বিজ্ঞান শিক্ষা চালু হল। এভাবে প্রায় ছ'বছর চেষ্টার পর ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি কলকাতায় সায়েন্স অ্যাসােসিয়েশন জন্ম নেয় । এই প্রতিষ্ঠানে সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বে ছিলেন দেশের মানুষ । প্রতিদিন নিয়মিতভাবে ডা . মহেন্দ্রলাল সরকার অ্যাসােসিয়েশনে বক্তৃতা দিতেন । তার ধারণা ছিল আমাদের দেশের ছাত্ররা যদি ঠিকমতাে সুযােগসুবিধা পায় তাহলে তারাও এগিয়ে যেতে পারবে । বিশেষ করে কলেজ পাঠের পর যাতে ছাত্ররা বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা এবং চর্চা করতে পারেন তাদের জন্যই সায়েন্স অ্যাসােসিয়েশনের জন্ম । এখান থেকে বহু ছাত্রকে খরচ করে । বিদেশেও পাঠানাে হয় । নােবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক স্যার চন্দ্রশেখর রমন ও অন্যান্য বহু বৈজ্ঞানিক এই প্রতিষ্ঠানে তাদের গবেষণার সুযােগ পেয়ে যশস্বী হয়েছেন । মহেন্দ্রলাল নিজে কোনাে বৈজ্ঞানিক তথ্য আবিষ্কার করেননি । সেই অর্থে কোনাে মৌলিক গবেষণাও করেননি । কিন্তু ভারতবর্ষে বিজ্ঞানচর্চার আদি গুরু বলে চিরকাল পুজ্য হবেন । সায়েন্স অ্যাসােসিয়েশন ডাক্তার সরকারের জীবনের সাধনা কল্পনা স্বপ্ন ।





১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে সরকার তাকে সি . আই . ই . উপাধিতে ভূষিত করেন । ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ‘ ডক্টর - ইন - ল ’ পদবি দেওয়া হয় । এই বিজ্ঞান মহাসাধকের ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় ।



Post a Comment

0 Comments