
বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মধ্যেই অনেক বিজ্ঞানী তার কাজকে সীমবদ্ধ রাখেন না । নিজের প্রচেষ্টায় দেশকে গড়ার স্বপ্ন ও কোনো কোনো বিজ্ঞানী দেখেন । দেশের অগণিত অনাথ , অসহায় মানুষদের জন্য কোনো কিছু করার প্রবণতা কোনো কোনো বিজ্ঞানীর থাকে । আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এরূপ একজন বিজ্ঞানী । ইনি ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ২ আগস্ট বাংলাদেশের খুলনা জেলার রাডুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতা হরিশ্চন্দ্র রায় জমিদার ছিলেন । ইংরেজি , সংস্কৃত , ফারসি প্রভৃতি ভাষায় তাঁর জ্ঞান ছিল অসাধারণ । পিতার লাইব্রেরির সমস্ত বই স্কুলজীবনেই প্রফুল্লচন্দ্র পড়ে শেষ করেন । বিভিন্ন বইয়ের মধ্যে রসায়নবিদ গোবিন্দাচার্যের রসায়ন গ্রন্থ তাঁকে অধিক উৎসাহিত করে ।
রাডুলি গ্রামের পাঠ শেষ করে ১০ বছর বয়সে হেয়ার স্কুলে তিনি ভর্তি হন । সেখান হতে এনট্রান্স পাশ করে মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হন । তিনি গিলক্রাইস্ট বৃত্তিসহ বি.এ. পাশ করার পর বিলেতের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এস. - সি . - তে ভর্তি হন । বিজ্ঞানী পি.জি. টেট এবং এ . সি . ব্রাউনের অধীনে গবেষণা করে মাত্র ২৭ বছর বয়সে ডি.এস.সি. হন এবং হোপ পুরস্কার পান ।
তিনি স্বদেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক হন । তাঁর পাণ্ডিত্যে বহু ছাত্র ও শিক্ষিত ব্যক্তিরা মুগ্ধ হন এবং বহু ছাত্র বিজ্ঞান পড়ায় আকৃষ্ট হন । তাঁর উল্লেখযোগ্য আবিষ্কারের মধ্যে মারকিউরাস নাইট্রেট নামক যৌগিক পদার্থ উল্লেখযোগ্য । পারদের সঙ্গে পাতলা নাইট্রিক অ্যাসিড মেশালে এই পদার্থ পাওয়া যায় । একেই আমরা রসসিন্দুর বলি । তার এই আবিষ্কারের ফলে পারদের যৌগের একটি সংখ্যা বৃদ্ধি পেল । আরও কতগুলো যৌগ নিয়ে তিনি গবেষণা চালান।
প্রফুল্লচন্দ্র বহু সম্মানের অধিকারী হন । ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সি . আই . ই . এবং নাইট উপাধি দেয় । কলকাতা , ঢাকা , বারাণসী ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি . এস - সি . উপাধি প্রদান করে । ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের তিনি মূল সভাপতি হন । মিউনিখের ডয়েটস অ্যাকাডেমি ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে সদস্যরূপে নির্বাচিত করে । লন্ডনের কেমিক্যাল সোসাইটি ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে সদস্য তালিকাভুক্ত করে নেয়।
তার স্বদেশপ্রেম ছিল গভীর । তিনি গান্ধিজির চরকা ও খদ্দরের প্রতি আকৃষ্ট হন । তিনি বলতেন , চাকুরিপ্রিয়তা আমাদের ‘ জাতীয় কলঙ্ক ’ ।
ইংরেজ ও দেশীয় পুঁজিপতিরা ভারতবাসীকে শোষণ করছে বলে তাঁর মনে আক্ষেপ ছিল । তাই চাকুরির বদলে বাঙালি যুবকদের তিনি ব্যবসা করতে উৎসাহিত করতেন। ইংরেজরা বাঙালি যুবকদের মনে যে চাকুরি করার নেশা সৃষ্টি করেছে তা থেকে যুবকদের মুক্ত করতে তিনি সর্বদাই আগ্রহী ছিলেন । তিনি বলতেন , “ মূলধন ব্যবসার বাধা নয় । ইচ্ছাই হল মূল কথা । ”
বিজ্ঞানচর্চা ও ব্যবসাকে তিনি উন্নতির শ্রেষ্ঠ পথ বলে মনে করতেন । জাপানের মতো ভারতকে কুটিরশিল্পে উন্নত করার স্বপ্ন তিনি দেখতেন । মাত্র সাতশত টাকা মূলধন নিয়ে তিনি ' বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস ' স্থাপন করেন । অচিরেই উহা একটি নামি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি মিতব্যয়ী ছিলেন । ব্যয়বাহুল্য তিনি পছন্দ করতেন না । তিনি অকৃতদার ছিলেন । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি স্ত্রী এবং ছাত্রদের পুত্র বলতেন । আজীবন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন । ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের বন্যায় তিনি তাঁর সবকিছুই দান করেন । তাঁর রচিত ' হিস্টি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি ' পুস্তক হিসাবে বিজ্ঞানসাহিত্যে বিরাট সম্পদ । তাছাড়া জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি , সমাজ সচেতন , আত্মনির্ভরশীল এই বিজ্ঞানী আমাদের দেশের অচেতন মানুষকে জাগিয়ে তুলতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন । ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ১৬ জুন এই কর্মযোগী বিজ্ঞানীর মৃত্যু হয়।
তার প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালের ঔষধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আজও আমরা ব্যবহার করি । কিন্তু ওই সময় আমরা কি মনে করি , ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের কথা ? বেকার যুবকদের জন্য তাঁর মতো একজন বিজ্ঞানীর প্রচেষ্টা ও ভাবনাচিন্তা আমাদের এযুগে অনুধাবন করা উচিত ।
0 Comments