গ্রামের পাঠশালায় পড়াশােনার পর রাজনারায়ণ মাত্র ৭ বছর বয়সে কলকাতায় এসে আর একটি পাঠশালায় ভর্তি হন । পরে তিনি হেয়ার সাহেবের স্কুলে ভর্তি হন । এখানে তাঁর সুতীক্ষ্ণ প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় । শেষ পর্যন্ত ফ্রি ছাত্ররূপে তিনি হিন্দু স্কুলে ভর্তি হন । হিন্দু কলেজে একদিকে তিনি যেমন মেধাবী বন্ধু ( দয় পেলেন অপরদিকে ডি . এল . রিচার্ডসন নামক সাহিত্যের এবং মিস্টার ব্রিজ নামক গণিতের অধ্যাপকের সংস্পর্শ লাভ করে নিজের প্রতিভা বিকাশের সুযােগ পান । মাইকেল মধুসূদন দত্ত , আনন্দমােহন বসু , ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র , প্যারীচরণ সরকার , জ্ঞানেন্দ্রমােহন ঠাকুর তার সহপাঠী ছিলেন ।
১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজের পাঠ সমাপ্ত করে রাজনারায়ণ দুবছর পরে ব্রাহ্মসমাজে যােগ দেন । তিনি উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদের কাজে লিপ্ত হন । তিনি ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের দ্বিতীয় ইংরেজি শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হন।
ইংরেজি ভাষায় তিনি খুব দক্ষ ছিলেন । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর , দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ , মদনমােহন তর্কালঙ্কার প্রভৃতি রাজনারায়ণের কাছে বন্ধুরূপে উপস্থিত । হয়ে ইংরেজি শিক্ষা লাভ করতেন । তিনি ১৮৫১-১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেদিনীপুরে যােগ্যতার সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের কাজ করেন ।
শিক্ষাবিদরূপে রাজনারায়ণ দক্ষতার পরিচয় দেন ইংরেজি শিক্ষাকে অগণিত মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে তিনি আগ্রহী ছিলেন । শিক্ষকরা শুধু শিক্ষার সহিত যুক্ত থাকবেন না , সমাজের কথাও তাদের ভাবা প্রয়ােজন — একথা তিনি বেশ ভালােভাবেই উপলব্ধি করেন বলে তিনি ধর্ম , সমাজ সংস্কার , শিক্ষা প্রসার , কুসংস্কার দূরীকরণ প্রভৃতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন । এদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে তিনি একজন আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন ।
একথা বিনা দ্বিধায় বলা যায় যে , একজন আদর্শ শিক্ষকের সমস্ত গুণই রাজনারায়ণের চরিত্রে বিদ্যমান ছিল । এ সময় তিনি জেলা স্কুলের উন্নতি সাধন , ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন , সুরাপান নিবারণী সভা স্থাপন প্রভৃতি সমাজসেবামূলক কাজ করে বিখ্যাত হন । এ সময়ে তার শরীর অত্যধিক পরিশ্রমে খারাপ হয়ে পড়ে । একটু সুস্থ হলে তিনি ব্রাহ্মসমাজকে নরপূজা নিবারণের প্রচেষ্টা , হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বক্তৃতার ব্যবস্থা , হিন্দু কলেজের ছাত্রদের পুনর্মিলন উৎসব , বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে বক্তৃতা ও কর্মসূচি ইত্যাদি কাজ করেন । তিনি বৃদ্ধ হিন্দুর আশা ’ নামক প্রবন্ধ ও সারধর্ম বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করে প্রসিদ্ধি লাভ করেন ।
এই সময় নরপূজার আন্দোলন ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে চলছিল । অপরদিকে ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেই ব্রাহ্মবিবাহ আইনের আন্দোলন উপস্থিত হল । এমত অবস্থায় ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্বে উত্তর কলকাতায় এক জাতীয় সভার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । ব্রাহ্মগণ ব্যতীত সে যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষীরাও ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন । রাজনারায়ণ বসুর বক্তৃতা সকলের কাছে প্রশংসিত হয় । সে সময় সােমপ্রকাশে লেখা হল— “ হিন্দুধর্ম নির্বাণােন্মুখ হইতেছিল রাজনারায়ণ বসু তাহাকে রক্ষা করিলেন ।
” তিনি খুব ভালাে বাগ্মী ছিলেন । হিন্দু কলেজের ইতিবৃত্ত বিষয়ক তার বক্তৃতা হিন্দু কলেজের ইতিহাস সংক্রান্ত ঘটনার একটি দলিল । তিনি ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে স্বাস্থ্যলাভের উদ্দেশ্যে দেওঘর যান । এখানে বসেই ‘ অ্যান ওল্ড হিন্দু’জ হােপস ’ নামক ইংরেজি পুস্তক রচনা করেন ।
অল্প কয়েকদিন পরে তাম্বুলােপহার ’ নামক একখানি পুস্তক রচনা করেন । ব্রাহ্মধর্মের একনিষ্ঠ সেবক হওয়া সত্ত্বেও রাজনারায়ণ খাঁটি হিন্দু ছিলেন । তিনি সে - যুগের শ্রেষ্ঠ সমাজ - সংস্কারক ও ধর্ম - সংস্কারক । এই কর্মযােগী পুরুষ ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে পক্ষাঘাত রােগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ।

0 Comments