ভারতের উত্তরে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা পৃথিবীর বৃহত্তম পর্বতমালা । এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনােরম । সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গে সুশােভিত এই পর্বতমালা দেশ - বিদেশের মানুষের বিস্ময়ের বস্তু । এভারেস্ট ইহার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ । একথা প্রত্যেকেই জানে । কে কীভাবে এই শৃঙ্গের উচ্চতা নির্ণয় করেছেন সে সম্পর্কেও জানা প্রয়ােজন ।
এভারেস্ট - এর উচ্চতা হল ২৯০০২ ফুট অর্থাৎ প্রায় সাত মাইলের মতো — এ তথ্য কোনাে বিদেশীর আবিষ্কার নয় । এই তথ্য একজন বাঙালির । আমরা এজন্যে গৌরববােধ করতে পারি । এই বাঙালির নামই রাধানাথ শিকদার ।
কলকাতার শিকদার বাগানে ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে রাধানাথ শিকদার জন্মগ্রহণ করেন । শৈশব হতেই পড়াশােনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন । মাত্র এগারো বছর বয়সে হিন্দু কলেজে ভর্তি হন । গণিতশাস্ত্রেই তার আগ্রহ ছিল বেশি । গণিতচর্চায় তার কখনও ক্লান্তি ছিল না । তিনিই বাঙালিদের মধ্যে প্রথম প্রিন্সিপিয়া ( Principia ) নামক পুস্তক পড়েছিলেন । হিন্দু কলেজে তখন ডিরােজিও যুগ । রাধানাথ অল্পদিনে ডিরােজিওর প্রিয়পাত্র হয়ে যান । ডিরােজিওর প্রভাবে তখন নব্য বাঙালি সমাজ গড়ে ওঠে । হিন্দুধর্মের কুসংস্কার পরিত্যাগ করে খাটি সাহেব হয়ে ওঠার বাসনা সে যুগের তরুণদের মনে জেগেছিল । মাইকেল মধুসূদন দত্তের সঙ্গে রাধানাথও উক্ত ইঙ্গ - বঙ্গ সমাজের অংশীদার হলেন ।
হিন্দু কলেজের প্রথম বার্ষিকের ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায়ই রাধানাথ ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে সার্ভে অফিসের কাজের আহ্বান পেলেন । ত্রিশ টাকা বেতনের সেই কাজ তিনি গ্রহণ করেন । জর্জ এভারেস্ট তখন তার উপরতলার কর্মচারী । পদোন্নতি হতে হতে রাধানাথের বেতন ছ শত টাকায় দাঁড়ায় । সে যুগে এই অঙ্কের বেতনের কথা ভাবাই যায় না । সার্ভে সংক্রান্ত গণিতে রাধানাথের বিস্ময়কর প্রতিভা ছিল কর্নেল থুলিয়ার সার্ভে সংক্রান্ত পুস্তকের অধিকাংশ গণনা তিনিই করেছিলেন ।
প্রতিভা কখনও চাপা থাকে না । তার নির্ভুল গণনাতেই প্রথম জানা যায় যে এভারেস্টের উচচতা ২৯০০২ ফুট । বিপদসঙ্কুল ও দুর্গম পর্বতে আরােহণ করে অক্লান্ত পরিশ্রম করে , জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাধানাথ যে সাফল্য অর্জন করেন তা শুধু তাঁরই গৌরব নয় , সকল বাঙালিরই গৌরব । অবশ্য তিনি তাে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একজন বাঙালি তখন ভারতীয় কর্মী মাত্র । তাই তার উপরতলা অফিসারের নামানুসারে উক্ত শৃঙ্গের নাম হল মাউন্ট এভারেস্ট । এভারেস্টের উচ্চতা ২৯০০২ ফুট বা ৮৮৪৮ মিটার । এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয়ের মূল পথপ্রদর্শক রাধানাথ শিকদার । অনন্যসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা না থাকলে তার পক্ষে এই দুরূহ কাজ করা সম্ভব হত না ।
১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে তার পিতা মারা যান । কিছুকাল পরে তিনিও অবসর নেন । অবসর গ্রহণ করে তিনি সাহিত্যচর্চায় মন দেন । প্যারীচাঁদ মিত্র তাঁর বন্ধু ছিলেন । তাঁর সহযােগিতায় রাধানাথ ‘ মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন । এই পত্রিকায় সহজ ভাষায় 'স্ত্রী সন্দর্ভ' প্রকাশ করতেন । শুধু গণিতরসিকই তিনি নন , তিনি সাহিত্যরসিকও ছিলেন ।
অন্তরের সৌন্দর্য পিপাসা তাকে হিমালয়ের রহস্য সন্ধানে উৎসাহিত করে । তুষারাবৃত হিমালয়ের উচ্চতা ২৯০০২ ফুট নির্ণয় করে দেশবাসীর কাছ হতে ধন্যবাদ পান । প্রকৃতপক্ষে তার এই প্রচেষ্টা বিজ্ঞান সাধনারই ফল । তাই রাধানাথ শিকদারকে বিজ্ঞানী বলা অযৌক্তিক নয় । গণিত বিজ্ঞানের একটি দিককে তিনি দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছেন ।

0 Comments